Monday, July 22, 2024
- Advertisment -spot_img

পরিবেশ চর্যার মাধ্যমে অনন্য নজির প্রত্যন্ত গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে

  • বিদ্যালয় একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তাই বিদ্যালয় তার সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়াতে পারে না। বিদ্যালয় তার কর্মকাণ্ড গুলো শিশুদের মাধ্যমে সমাজে প্রেরণ করে এবং সমাজ তা গ্রহণ করে পুষ্ট হয়। বিদ্যালয় বিভিন্ন পাঠক্রমের মাধ্যমে শিশুদের বৌদ্ধিক, মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ব্যবস্থা করে থাকে। বিদ্যালয় শিক্ষায় শিশুদের মূল্যবোধ নৈতিকতা ও উন্নত সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সহায়তা করা বিদ্যালয় শিক্ষার এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বর্তমানে প্রাচ্যের শিক্ষা সংস্কৃতিকে অবহেলা করে আমরা পাশ্চাত্যের শিক্ষা সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছি।যার ফলে অতি দ্রুত হারে সামাজিক অবক্ষয় সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আর এক দিকে সমাজের একটি বৃহত্তর অংশ লোভ লালসার বশবর্তী হয়ে অসচেতন ও অপরিকল্পিত ভাবে নগর উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, বাড়ি কলকারখানা, স্থাপন করতে গিয়ে যথেচ্ছ হারে বৃক্ষাচ্ছেদন করছে ও অত্যধিক হারে জনবিস্ফোরণ সত্যেও প্রয়োজন অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ না করার ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন এর সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানব সভ্যতা আজ গভীর অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। তাই এই সামাজিক অবক্ষয় ও পরিবর্তিত পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বিদ্যালয়ে হাতে কলমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমান্তরালে পরিবেশ ও সামাজিক শিক্ষার পাঠ ও অনুশীলন আজ খুবই প্রাসঙ্গিক। এই সম্পর্কে আমার ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা খুবই মধুর ও প্রাণবন্ত। আমি দীর্ঘ 10 বছর অন্যান্য বিদ্যালয়ে সহ শিক্ষক হিসাবে শিক্ষকতার পর বাড়মংরাজপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যখন যোগদান করি (21/12/2013)তখন আমার বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা ছিল 102। এই 102 জন ছাত্র ছাত্রীর 90 শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় পরিবার অধ্যুষিত। এবং 30 শতাংশ ছাত্র ছাত্রী দামোদর নদীর তীরবর্তী এলাকায় ইট ভাটায় কর্মরত শ্রমিকদের শিশুদের সাথেই মেলামেশা করে। সঙ্গত কারণেই অন্যান্য বিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন যখন একমাত্র লক্ষ্য সেখানে আমাদের বিদ্যালয়ে শিশুদের শিক্ষার মানোন্নয়ন এর সাথে সাথে শিশুদেরকে বিদ্যালয়ের আঙিনায় নিয়ে আসা ও বিদ্যালয়ের পঠনপাঠন চলাকালীন তাদেরকে আনন্দ পরিসরে ধরে রেখে পাঠদান এক অন্যতম চ্যালেঞ্জ। কারণ মোট ছাত্র ছাত্রীদের 50 শতাংশ ছাত্র ছাত্রী বিদ্যালয়ে আসতো না।ক্রমে তারা স্কুলছুট বাছায় পরিণত হতো। বিদ্যালয়ে যারা আসতো তাদের বেশিরভাগ শিশুই বিদ্যালয়ে কিছু সময় কাটিয়ে মিড ডে মিল খেয়ে বাড়ি চলে যেত। এই সমস্যার সমাধান করতে মাতা- শিক্ষক মিটিং করেও কোনো আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। কোনো উপায় না পেয়ে শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সাথে কথা বলে বুঝেছি বিদ্যালয়ের বাচ্চাদের মধ্যে সম্প্রদায় গত ভাবে মেলামেশার ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাব ও অসংগতি আছে। বিদ্যালয় পরিবেশ শিশুদের মনোযোগী করে তুলতে পারেনি। বিদ্যালয়ে শিশুদের ব্যবহারের জন্য কোনো টয়লেট নেই। এই সমস্যা গুলির সমাধান করে বিদ্যালয়ে শিশুদের আনন্দ কলরবে পরিণত করার জন্য আমরা কিছু অভিনব পন্থা অবলম্বন করি। প্রথমেই শিশুদের মনকে আকর্ষণ করে এমন কিছু পঠনপাঠনে মনোযোগী করে এমন কিছু খেলনা, শিক্ষাদান তাদের কাছে একঘেয়েমি না হয়ে আনন্দ দায়ক হয় এমন কিছু শিক্ষা সহায়ক উপকরণ শিশুদের নিয়েই হাতে কলমে তৈরি করে পাঠদান করা হয় যা শিশুদের মনকে পড়াশোনায় মনোযোগী করে তুলতে সক্ষম হয়। সুস্থ সুন্দর নির্মল বিদ্যালয় পরিবেশ গঠনে প্রথমেই বিদ্যালয়ে সবুজায়ন করা হয় বিভিন্ন রঙের ফুল, ফল, ভেষজ গুণাগুণের গাছ লাগিয়ে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিশুদের নামে লাগানো হয় একটি করে গাছ।প্রত্যেক শিশুর নামাঙ্কিত গাছটি সেই শিশুর বন্ধু বা সখা। প্রতিটি শিশু তার বন্ধু গাছের পরিচর্চা করবে সারা বছর। একটি মাসে যতগুলি শিশুর জন্মদিন থাকবে, মাসের শেষে একটি নির্দিষ্ট দিনে সেই সংখ্যক শিশুর জন্মমাস পালিত তাদের বন্ধু গাছের গোড়ায় তাকে বার্থ ডে ক্যাপ পরিয়ে নিয়ে আসা হয়, শিশু তার নিজে হাতে তৈরি সামাজিক বার্তা দেওয়া রাখি পরিয়ে দেবে তার বন্ধু গাছকে। আমাদের এই কর্মসূচির নাম ” বৃক্ষ সখা জন্মমাস”। এই ভাবে বিদ্যালয়ে গড়ে উঠছে প্রকৃতি ও মানবের অপরূপ মেলবন্ধন। সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ ভুলে শিশুরা নিজের অজান্তেই মেতে উঠেছে প্রকৃতি চর্চায়। পরিবেশ সংকটের আরও বহুবিধ কারণকে ছাত্র ছাত্রীদের কাছে তুলে ধরতে ও শিশুদের প্রাণোচ্ছল ভাবে বিদ্যালয়ের আঙিনায় নিয়ে আসতে বিদ্যালয়ের আরও এক অভিনব কর্মসূচি Eco-friendly পাওয়ার বল প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় থাকে 4 টি টিম (সবুজ বাহিনী এই টিমের বার্তা” গাছ লাগাবো মোরা, সবুজ হবে ধরা”। জল ধরো,জল ভরো এই টিমের বার্তা জল করলে নষ্ট, পরে হবে কষ্ট ” মাঠে পাঠান, মোবাইল ছাড়ান এই টিমের বার্তা ” বই পড়ি, দেশ গড়ি “। প্লাস্টিক মুক্ত পৃথিবী এই টিমের বার্তা Just say no to plastic”) Eco-friendly পাওয়ার বল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুরা খেলাচ্ছলে প্রকৃতি মায়ের সেবার ও সামাজিক শিক্ষার অভিজ্ঞতা লাভ করে সমৃদ্ধ হচ্ছে। বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচি গুলো বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের বিকাশের জন্য গঠিত শিশু সংসদের মন্ত্রী পরিষদের পরিচালনায় দৈনন্দিন জীবনে হাতে কলমে আনন্দের সাথে আগ্রহ ভরে অংশগ্রহণ করে শিখছে। আমাদের বিশ্বাস, আশা ও ভরসা আছে যে এই শিশুরা একদিন দায়িত্বশীল সুনাগরিক হয়ে বিদ্যালয়ের এই চিন্তা ভাবনা গুলো সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে বাস্তবায়িত করবে। শিশুদের নিজেদের হাতে দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলার লক্ষে ও সমাজ জীবনে বিদ্যালয়ের চিন্তা ভাবনা গুলো অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করে বিদ্যালয় সমাজের মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য আমরা সমস্থ শিক্ষক শিক্ষিকা প্রাক্তন বর্তমান ছাত্র ছাত্রী সম্মিলিত ভাবে বিদ্যালয় সন্নিহিত দুই গ্রাম ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জনমানসে সচেতনতার লক্ষ্যে বিদ্যালয়ের এই কর্মকাণ্ড গুলো তুলে ধরে চলেছি। বিদ্যালয় সমাজের মেলবন্ধন এর কর্মসূচির নাম দিয়েছি School to community, এছাড়াও আমরা শিক্ষক- শিক্ষিকা বিদ্যালয়ের সমস্ত ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অভিভাবকরা কেন তাদের সন্তানকে ভর্তি করবেন সেই জন্য বিদ্যালয়ের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে শিক্ষা, পরিবেশ, সামাজিক ও সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প -সবুজশ্রী, শিক্ষাশ্রী, ঐক্যাশ্রী, কন্যাশ্রী জল ধরো/জল ভরো, প্লাস্টিক বর্জন ইত্যাদি) বিদ্যালয় সন্নিহিত দুই গ্রাম Student week-এ (2র জানু: থেকে 7 ই জানু) পদযাত্রা করে অভিভাবকদের সচেতন করি। বিশ্ব জলাভূমি দিবস ( 2 রা ফ্রেব্রু:) ও 3 রা মার্চ বিশ্ব বন্যপ্রাণ দিবস গড়চুমুক মিনি জু- এর সাথে বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে পালন করে থাকি এবং বিশ্ব জল দিবস (22শে মার্চ) পোস্টার ব্যানার সহযোগে জল সংরক্ষণ ও জল অপচয় রোধ করার বিষয়ে স্লোগান পোস্টার নিয়ে পদ যাত্রা সহযোগে করে থাকি। বিদ্যালয় সমাজের সাথে মেলবন্ধন করে কাজ করার ফলে বিদ্যালয়ের প্রতি এলাকাবাসীর আনুগত্য বেড়েছে। যার ফল স্বরূপ বিদ্যালয়ে শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতি। ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি। এখন বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা 157. প্রতিদিন বিদ্যালয় ভরে উঠছে শিশুদের আনন্দ কলরবে। বিদ্যালয় ভরে উঠেছে বিভিন্ন রঙের ফুল, ফলে, ভেষজ উদ্ভিদে। নজর পড়েছে বিভিন্ন Social media তো বিভিন্ন মিডিয়াতে বিদ্যালয়কে নিয়ে চলছে নিয়মিত লেখালেখি। বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরের নজরে আশায় বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের টয়লেটের সমস্যা মিটেছে। হাওড়া জেলা পরিষদ থেকে বিদ্যালয়ে করে দেওয়া হয়েছে পরিবেশ বান্ধব সোলার প্যানেল। আমাদের আশা বিদ্যালয় School To Community কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী দিনে সমাজকে দেখাবে নতুন দিশা।

 

নাম – রাজদূত সামন্ত, প্রধান শিক্ষক, বাড়মংরাজপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়

উলুবেড়িয়া, হাওড়া

RELATED ARTICLES

कोई जवाब दें

कृपया अपनी टिप्पणी दर्ज करें!
कृपया अपना नाम यहाँ दर्ज करें

spot_img

Most Popular

Recent Comments